বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে অন্যতম মারাত্মক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর রোগ হলো রাণীক্ষেত। প্রতি বছর এ রোগের প্রাদুর্ভাবে খামারিদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়ায়, বিশেষ করে শীত ও বসন্তকালে রোগটির প্রকোপ বেশি দেখা যায়। তবে বছরের অন্যান্য সময়েও এটি সংক্রমিত হতে পারে। রোগটি সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল শহরে শনাক্ত হয়, যার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এটি নিউক্যাসল ডিজিস নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ভারতের রানীক্ষেত অঞ্চলে রোগটির অস্তিত্ব ধরা পড়ায় উপমহাদেশে এটি রাণীক্ষেত রোগ নামে পরিচিতি লাভ করে।
রাণীক্ষেত একটি ভাইরাসজনিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা মুরগির শ্বাসনালী, অন্ত্রনালী ও স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। সংক্রমণের তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। রোগের তীব্রতার ভিত্তিতে এটি ভেলোজনিক, মেসোজেনিক ও লেনটোজেনিক, এই তিন ধরনের রূপে দেখা যায়। ভেলোজনিক ধরনটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং দ্রুত মৃত্যুহার বৃদ্ধি করে, মেসোজেনিক মাঝারি মাত্রার এবং লেনটোজেনিক তুলনামূলকভাবে হালকা প্রকৃতির হলেও খামারে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়।
আক্রান্ত মুরগির ক্ষেত্রে সবুজ বা সাদা চুনের মতো পাতলা পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, হাঁ করে নিঃশ্বাস নেওয়া, খাদ্যে অনীহা এবং অবসাদ লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হওয়ায় ঘাড় বাঁকা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণও দেখা দেয়। রোগটি সরাসরি আক্রান্ত মুরগির সংস্পর্শে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া আক্রান্ত মৃত মুরগি খোলা স্থানে ফেলে রাখলে কাক, শকুন, শিয়াল বা কুকুরের মাধ্যমে ভাইরাস বিস্তার লাভ করতে পারে, যা একটি খামার থেকে অন্য খামারে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
রাণীক্ষেত প্রতিরোধে সচেতনতা ও নিয়মিত ভ্যাকসিন প্রয়োগই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। মুরগির বাচ্চার তিন থেকে পাঁচ দিন বয়সে প্রথম ভ্যাকসিন প্রদান এবং একুশ দিন বয়সে বুস্টার ডোজ দেওয়া জরুরি। খামারের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনে কিল্ড ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা যেতে পারে। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে টাইটার পরীক্ষা করানো উত্তম, যাতে খামারিরা রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। সঠিক ব্যবস্থাপনা, বায়োসিকিউরিটি এবং সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে রাণীক্ষেত রোগের মারাত্মক প্রভাব থেকে পোল্ট্রি শিল্পকে অনেকাংশে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
ডা. আফসানা ফেরদৌসী
সিনিয়র ম্যানেজার, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল অ্যাফেয়ার্স
ভেটমেডিক্স