ফিচার ডেস্ক:
‘ওরে ভোঁদড় ফিরে চা, খোকার নাচন দেখে যা!’ শৈশবে এই ছড়া পড়েনি দেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অদ্ভুত প্রাণী ভোঁদড় বা উদবিড়াল। বিশ্বব্যাপী এদের প্রজাতি আছে ১৩টি। বাংলাদেশে অন্তত তিনটির বিচরণ স্বীকৃত।
আগের দুটি প্রজাতি—এশীয় ছোট উদবিড়াল (Asian Small-clawed Otter) ও মসৃণ উদবিড়াল (Smooth-coated Otter)। দেশে ইউরেশীয় ভোঁদড় বা উদবিড়ালের (Eurasian Otter) প্রথম স্বীকৃত প্রমাণ পাওয়া গেল ২০২১ সালের একটি ঘটনার বদৌলতে।
এশিয়া ও ইউরোপের বিপুল ভূখণ্ডজুড়ে—ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তরাংশ, তুর্কি অঞ্চল, ইরান-তুরান-আফগান দিয়ে হিমালয় পর্বত বেয়ে ইন্দোচীন এবং দক্ষিণ চীনে ইউরেশীয় উদবিড়ালের বিচরণ। সাত থেকে ২৮টি উপপ্রজাতিতে বিভক্ত এরা।
ওজনে এরা সাত থেকে ১২ কেজির হয়ে থাকে। দু-তিন ফুট দীর্ঘ দেহের সঙ্গে মানানসই এক-দেড় ফুট এদের লেজ। অনুমিতভাবেই প্রধান খাদ্য মাছ। জলজ প্রাণী, পাখিও এরা খায়।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভোঁঁদড় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণার সংখ্যা ১০টিও হবে না। গবেষকদের অনেকেই অনুমান করেছেন, বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেটের জলাঞ্চলে বা পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউরেশীয় ভোঁদড় থাকতে পারে। বিক্ষিপ্ত গবেষণা থেকে পরবর্তীকালে সিলেট অঞ্চলে ছোট উদবিড়াল এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী চরাঞ্চলে মসৃণ উদবিড়ালের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু ইউরেশীয় উদবিড়ালের ব্যাপারটি ছিল অনুমান পর্যন্ত।
এমনকি সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ, মিজোরাম, মেঘালয় বা ত্রিপুরা অঞ্চলেও এই প্রজাতির ভোঁদড়ের নিশ্চিত উপস্থিতির প্রমাণ নেই।
ইউরেশীয় প্রজাতিটি একা বা জোড়ায় বিচরণ করে। এদের পছন্দ দুর্বল ও ছোট স্রোতের পার্বত্য ছড়া বা ঝিরি ও সংলগ্ন বন। স্বাভাবিকভাবেই সিলেটের পাথারিয়া বা বাংলাদেশের কাসালাং-সাঙ্গু বনাঞ্চল এদের জন্য আদর্শ।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন কাসালাং। কাপ্তাইয়ের উত্তরে, খাগড়াছড়ির উত্তর-পূর্বাংশে একই নামের নদী, অসংখ্য খাল-ঝিরির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বনটি জীববৈচিত্র্যে ঠাসা। ১৮৮১ সালে এক লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ হেক্টর বন সংরক্ষিত ঘোষিত হলেও বর্তমানে ৪০ হাজার হেক্টরের মতো কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে। এই অংশও আবার নিরাপত্তাহীনতার কারণে অগম্য। ফলে কাসালাংয়ের সমৃদ্ধ জীবজগৎ মানুষের আড়ালে আছে। তবে মাঝেমধ্যে চিত্তাকর্ষক খবর মেলে। গৌর, ডোরা বাঘ, রাজ ধনেশ কিংবা সূর্য ভালুকের মতো পার্বত্য বনের মণি-মুক্তা এখনো কাসালাং চষে বেড়ায়। অধুনা পর্যটনদূষণে জেরবার সাজেকের উত্তর-পশ্চিম দিগন্তে যে বিপুল পাহাড় চোখে পড়ে, সেই সুদূর ভুলংতলী আর তার পাশের অঞ্চলে অদ্যাবধি ঘন বনরাজি জীববৈচিত্র্যে ঠাসা। সাজেক যাওয়ার পথের আশপাশে বনাঞ্চল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। এটি কাসালাংয়ের সীমানায় পড়েছে। এসব ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে প্রায় তিন দশক ধরে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলেও কখনোসখনো বিচিত্র দুর্লভ বাসিন্দাদের দেখা মেলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাসালাং নদীর দুই পারে বসতি বেড়েছে। এই কাসালাংয়ের গঙ্গারাম খালে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দুটি বিরল প্রাণী মাছ ধরছিল, থাকছিল। যেহেতু বিশেষ বিরান এলাকা নয়, মানুষের চোখে পড়তে আর কতক্ষণ! একদল জেলে অনেকটা না বুঝেই প্রাণীগুলোর সামনে পড়ে যায়। সচরাচর এ ক্ষেত্রে যা হয়, পিটিয়ে মারা হয় ওদের। জানতে পেরে হাজির হন স্থানীয় পরিবেশকর্মী সুবর্থ চাকমা। দুটি ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করেন। গল্পে এখানেই যতি পড়েছিল। অবশ্য তা দুই বছরের জন্য।রাঙামাটির গবেষক ও ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের কর্মকর্তা সৌরভ চাকমা। চলতি বছরের কোনো এক দিন আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) প্রকাশিত লাল তালিকা নেড়েচেড়ে দেখছিলেন। এই সংস্থার ক্যামেরা ট্র্যাপে এর আগে সাঙ্গু বনাঞ্চল থেকে গৌর, মেঘলা চিতা, এমনকি বড় বাঘের মতো প্রাণীর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
বছর দুয়েক আগে সুবর্থ চাকমার তোলা ছবি দুটি তাঁর চোখেও পড়েছিল। এখন বিপন্ন প্রাণীদের সূত্রে ছবি দুটি নিয়ে বিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বহু সময় খরচের পর অবশেষে খুঁজেও পান। বিরল প্রাণী দুটি ছিল ভোঁদড় বা উদবিড়াল। তবে বাংলাদেশে সচরাচর যাদের দেখা যায়, সেই দুটি প্রজাতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। সন্দেহ দূর করতে সহকর্মী শাহরিয়ার সিজার ও ঢাকা প্রাণীবিদ্যা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুনতাসির আকাশের দ্বারস্থ হলেন। আকাশ বাংলাদেশের মাংসাশী প্রাণী নিয়ে কাজ করছেন বহুদিন। সেই সূত্রে আরো কয়েকজন গবেষকের সহায়তায় নিশ্চিত হওয়া গেল ছোট কান, বিশেষ গড়নের নখ আর লম্বাটে মুখের প্রাণীগুলো আসলেই অনন্য। অদ্যাবধি বাংলাদেশে মেলা প্রথম ইউরেশীয় ভোঁদড় বা উদবিড়ালের উপস্থিতির নিশ্চিত প্রমাণ, যদিও মৃত! তত্ত্ব তালাশ করতে গিয়ে সৌরভ চাকমা পেয়ে যান আরো চমকপ্রদ তথ্য। বললেন, ‘স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য মতে, ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত গঙ্গারাম খাল সংলগ্ন স্থানে কয়েকটি ইউরেশীয় উদবিড়ালের বিচরণ ছিল। পুনরায় ওদের দেখা মেলে ২০২১ সালে। এরপর এখন পর্যন্ত আর কোনো উদবিড়াল দেখার খবর পাইনি।’
পরবর্তী সময়ে সৌরভ চাকমা ও মুনতাসির আকাশ যৌথভাবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অটার জার্নালের (OTTER, Journal of the International Otter Survival Fund) ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘ফার্স্ট এভিডেন্স অব ইউরেশিয়ান অটারস ইন পোস্ট-ইনডিপেনডেন্স বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
ভোঁদড়দের এই প্রজাতি ইউরোপে বেশ পাওয়া গেলেও দক্ষিণ এশিয়ার এই অংশে বেশ দুর্লভ। বাংলাদেশে অতি বিপন্ন। এ রকম একটি প্রাণীর উপস্থিতি কাসালাং সংরক্ষিত বনসহ পাহাড়ি বনের গুরুত্ব আরো বহুগুণে বাড়িয়ে তুলল। এই পর্যবেক্ষণটি শুধু বাংলাদেশ নয়, পাশের মিজোরাম, উত্তর মিয়ানমারসহ পুরো ইন্দো-বার্মা হটস্পটের উত্তর-পশ্চিম অংশের জন্য নতুন। নিঃসন্দেহে দারুণ এই আবিষ্কারের খবর। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মুনতাসির আকাশ বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলে বিস্তৃত কোনো জরিপ না হওয়ায় বলা যায় ইউরেশীয় ভোঁদরের মতো এমন অনেক ‘প্রথম’ ও বিরল প্রাণী বিদ্যমান থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে আপাতশূন্য বনাঞ্চলও বিস্ময়কর প্রাণীভাণ্ডার ধারণে সক্ষম। সে বিবেচনায় কাসালাং ও সংলগ্ন অঞ্চল বিস্তৃত গবেষণার দাবি রাখে।