নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এখনো আওয়ামী লীগের রাহুমুক্ত হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সিন্ডিকেট এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে গোটা বিএডিসি। আওয়ামী লীগের ওই সিন্ডিকেটের কাছে অনেকটা অসহায় বিএডিসি’র ডিলাররা।
অভিযোগ উঠেছে, ওই সিন্ডিকেটের বাইরে গুদাম থেকে ধান বীজ উত্তোলন করতে পারছেন না কোনো ডিলার। চলতি বোরো মৌসুমে বিএডিসির পুনঃনির্ধারিত দরের ধান বীজ ডিলারদের মধ্যে বরাদ্দ দেয় বিএডিসি। কিন্তু সারা দেশের ওই বীজের নিয়ন্ত্রণ নেন সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সিন্ডিকেট। বিএডিসির আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় দুই হাজার টন পুনঃনির্ধারিত দরের বোরো ধান বীজ ওই সিন্ডিকেট উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কুষ্টিয়া জেলা বিএডিসির বীজ ও সার ডিলার এসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক মোস্তফা জামান সাঈদী সাগর বলেন, বর্তমানে ডিলাররা চুয়াডাঙ্গা গুদাম থেকে কোনো বীজ উত্তোলন করতে পারছেন না। বিএডিসি’র কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রীর লোকজন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ডিলারদের হাজার হাজার টন ধান বীজ বিএডিসির কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে সাবেক মন্ত্রীর লোকজন উত্তোলন করে নিয়েছেন। ৫ই আগস্টের পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে বিএডিসিতে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করেছে ওই সিন্ডিকেট।
জানা যায়, দেশের সর্ববৃহৎ বীজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র চুয়াডাঙ্গায় অবস্থিত। অন্যদিকে বিএডিসির মুজিবনগর সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার কাজ এ অঞ্চলে চলমান রয়েছে।
বিএডিসি’র একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন, আওয়ামী লীগপন্থি বিএডিসির কৃষিবিদ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির ২০২২-২৩ মেয়াদে নির্বাহী সদস্য ছিলেন বর্তমানে ঢাকা কৃষি ভবনের মহাব্যবস্থাপক (বীজ) আবীর হোসেন ও একই কমিটির নির্বাহী সদস্য বর্তমানে অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (বীজ বিতরণ) সেলিম হায়দার। এই দুই কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনের সিন্ডিকেটকে নানা কৌশলে সহযোগিতা করে সক্রিয় করে রেখেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএডিসির ডিলাররা।
অভিযোগের বিষয়ে কৃষি ভবনের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (বীজ বিতরণ) সেলিম হায়দার বলেন, আমি মিটিংয়ে আছি। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে পরে কথা বলবো।
বিএডিসি’র চুয়াডাঙ্গা অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা বিএডিসির প্রসেসিং সেন্টারে প্রায় এক হাজার ৯ শত টন ও অধিক বীজ উৎপাদন কেন্দ্রে (বীউ) প্রায় ৯ শত টন বোরো ধান বীজ মজুত ছিল। মজুতকৃত বীজের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল খুলনা অঞ্চলের ডিলারদের জন্য বরাদ্দ। প্রসেসিং সেন্টার ও অধিক বীজের গুদামে শুধু খুলনা জেলার ডিলারদের বীজ ছিল প্রায় এক হাজার তিন শত টন। বাকি বীজ ছিল কুষ্টিয়া, ঢাকা, জয়পুরহাট, ফরিদপুর, রাজশাহী, যশোর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, বগুড়া, কুমিল্লা ও পাবনা জেলাসহ ২২ জেলার। গত ২রা মার্চ ঢাকা কৃষি ভবনের মহাব্যবস্থাপক (বীজ) আবীর হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে মজুতকৃত বীজের দাম কমিয়ে নতুন দর নির্ধারণ করেন। ওই পত্রের সঙ্গে একটি সংযুক্তি পত্রে পুনঃনির্ধারিত দরে বোরো ধান বীজ বিক্রির সময়াবদ্ধ ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে দেয়া হয়।
বিএডিসির ডিলারদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে ওই পত্রের কোনো কার্যকারিতা ছিল না। ঢাকার আওয়ামীপন্থি বিএডিসির কর্মকর্তারা অঞ্চলের কর্মকর্তাদের নিকট চিঠি প্রেরণ করে মৌখিকভাবে আওয়ামী সিন্ডিকেটকে বীজ দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। যার কারণে কয়েকজন ডিলার ছাড়া কোনো ডিলার বীজ উত্তোলন করতে পারেননি। ঢাকা কৃষি ভবনের আওয়ামীপন্থি দুই কর্মকর্তা আবীর হোসেন ও সেলিম হায়দারের মৌখিক নির্দেশে সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সিন্ডিকেট বিপুল পরিমাণ ধান বীজ উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করেছেন বলে জানান ডিলাররা।
কুষ্টিয়া জেলা বিএডিসির বীজ ডিলার এসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, পুরো বিএডিসিকে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি সিন্ডিকেট বিএডিসি নিয়ন্ত্রণ করছেন। এখানে ডিলাররা অসহায় হয়ে পড়েছে। এটা ভালো কোনো লক্ষণ নয়। এতে কৃষি সেক্টরে বড় প্রভাব পড়বে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত খুলনা বিএডিসির ডিএডি আনোয়ার হোসেন। আওয়ামী লীগের আমলে নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে তিনি একই কর্মস্থলে প্রায় ৭ বছর চাকরি করছেন। ঢাকার আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশে খুলনা বিএডিসির কর্মকর্তারা ওই অঞ্চলের স্থানীয় ডিলারদের নামে মেমো কেটে প্রায় এক হাজার দুইশ’ টন বীজ আওয়ামী সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিয়েছেন। খুলনা অঞ্চলের অধিকাংশ ডিলার পুনঃনির্ধারিত দরের বোরো ধান বীজ উত্তোলন করেননি বলে জানান।
অথচ নির্ধারিত ১০ই মার্চের মধ্যে সমুদয় বীজ ডিলাররা উত্তোলন করেছেন বলে দাবি করেন বিএডিসির খুলনা অঞ্চলের উপ-পরিচালক দীপঙ্কর। তিনি বলেন, আমরা ডিলারদের মেমো কেটে দিয়েছি। ডিলাররা কোথায় বা কার কাছে বিক্রি করছে তা আমাদের জানা নেই। যদি অফিস থেকে কোনো অনিয়ম হয়, সেটি আমি দেখবো।
খুলনা বিএডিসির বীজ ও সার ডিলার এসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, আমি কোনো বীজ পাইনি। তবে আমাকে অফিস থেকে অল্প কিছু টাকা দিয়েছে।
মেহেরপুর জেলার প্রবীণ বীজ ডিলার আরমান আলী বলেন, চুয়াডাঙ্গা গুদাম থেকে ডিলাররা কোনো ধান বীজ উত্তোলন করতে পারছেন না। আমি নিজে বীজ উত্তোলন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছি। একটি চক্র সব ধান উত্তোলন করছে। কিন্তু ডিলাররা গেলেই হুমকি-ধামকি দেয়া হচ্ছে। এখানে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার কোনো পরিবেশ নেই।
এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গা বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের (বীপ্রকে) যুগ্ম পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, বাইরে কী হচ্ছে আমি জানি না। আঞ্চলিক বীজ বিপণন দপ্তর থেকে যারা মেমো নিয়ে আসছেন, তাদেরকেই বীজ দেয়া হচ্ছে।