নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব কে পাবেন- তা নিয়ে একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সমালোচনা-সমালোচনা যেন থামছেই না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের অভিযোগ উঠেছে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক শামীমা সুলতানার বিরুদ্ধে। আবার অনধিকার চর্চা করে বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করেই যাচাই-বাছাই বিহীন কিছু সংখ্যাক শিক্ষার্থীদেরকে আর্থিক ছাড় দিয়েছেন তিনি।
অন্য শিক্ষকদের অভিযোগ, অবৈধভাবে জোরপূর্বক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে প্রশাসন ও কলেজ এডহক কমিটির দোহাই দিয়ে নানা অনিয়ম করছেন শিক্ষক শামীমা সুলতানা।
জানা গেছে, অধ্যক্ষের অবসরজনিত শূন্যতা পূরণে গত ১১ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ (এডহক কমিটি) সভা করে। গভর্নিং বডির সেই সভায় চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক শামীমা সুলতানাকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে বিষয়টির তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানায় কলেজটির শিক্ষকরা। শিক্ষকদের সিংহভাগ অংশ অধ্যক্ষের কার্যালয়ে তালা দেয়। টানা ১৭ দিন তালাবদ্ধ থাকে অধ্যক্ষের কক্ষ। পরে জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় বিষয়টির সমাধান হয়। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে বসেন শিক্ষক শামীমা সুলতানা। তবে ঘটনার নতুন মোড় নেয় গত ১১ মার্চ। এদিন এক পত্রের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে বসা শামীমা সুলতানাকে সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত উল্লেখ করে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দিয়ে নাম পাঠানোর নির্দেশনা দেয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক আব্দুল হাই সিদ্দিক সরকার স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয়, ‘পৌর কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক শামীমা সুলতানা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তি না হওয়ায় শামীমা সুলতানার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত। এমতাবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলী রেগুলেশন (সংশোধিত) ২০১৯ এর ধারা ৪ এর উপধারা ২(র) ও (রর) ধারা মোতাবেক অত্র কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামীমা সুলতানা-এর পরিবর্তে উপাধ্যক্ষ/জ্যেষ্ঠতম ০৫ (পাঁচ) জন শিক্ষকের মধ্যে হতে যেকোনো ০১ (একজন) শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করে আগামী ১০ (দশ) কার্যদিবসের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত রেজ্যুলেশন, এমপিও শীটের কপি, দায়িত্ব প্রদান সংক্রান্ত পত্র, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানপত্র ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ অধিভুক্তি নবায়নের কপিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
এই পত্র প্রাপ্তির পরদিন ১২ মার্চ কলেজটির আন্দোলনরত শিক্ষকরা পুনরায় অধ্যক্ষের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। তবে গতকাল রবিবার প্রলোভন দেখিয়ে পুনরায় ওই শিক্ষক শামীমা সুলতানা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দিয়ে অধ্যক্ষের কক্ষে ঝোলানো তালা ভেঙ্গে ফেলেছেন বলে অভিযোগ আন্দোলনরত শিক্ষকদের। আবার শিক্ষক শামিমা সুলতানার দাবি প্রশাসনের নির্দেশে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা বলেন, ‘মাউশি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি এবং নীতিমালা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ সহকারী অধ্যাপক নাজনীন আরা খাতুনের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার কথা। জ্যেষ্ঠ প্রভাষক শামীমা সুলতানাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয় এডহক কমিটি। কিন্তু তিনি ওই পদের যোগ্য নয়। সেটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন। তারপরও তিনি জোরপূর্বক দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা যারা আন্দোলনে ছিলাম, তারা অধ্যক্ষের কক্ষে তালা দিয়েছিলাম। তবে কলেজের সব কার্যক্রম চলছিলো। কিন্তু কয়েকজন ছাত্রের ফরম পূরণের ক্ষেত্রে কলেজের সকল খরচ মওকুফ করার প্রলোভন দেখিয়ে আজকে শিক্ষক শামিমা সুলতানা তালা ভেঙ্গেছেন। শুধু তাই নয়, তার তো অধ্যক্ষের যোগ্যতা নেই। তিনি তো অধ্যক্ষই হতে পারেন না। তবে তিনি একদিনে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার কাছাকাছি অর্থ শিক্ষার্থীদের গণহারে মওকুফ করেছেন। কিন্তু এটার জন্যও নীতিমালা আছে। সহযোগীতা পাওয়ার যোগ্যরাই এই সুবিধা পাবেন। এটা গণহারে সকলের জন্য নয়। কিন্তু তিনি সেসব কিছুই যাচাই-বাছাই করেননি।
তবে শিক্ষক শামিমা সুলতানা সকল দোষ দিচ্ছেন প্রশাসনের ওপর। তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসক, এডিসি জেনারেল ও এডহক কমিটির সদস্য সিদ্দিকুর রহমান তাকে দায়িত্ব দিয়েছে। তারা যতক্ষণ না সরতে বলবে, তিনি অধ্যক্ষের চেয়ারে বসেই থাকবেন।’
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্রের কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। চিঠি আমি পাইনি। আমাকে কেউ বলেওনি।’ এ সময় তালা ভাঙ্গার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এডিসি স্যার ওসিকে বলে দিয়েছেন, তারা তালা ভেঙ্গেছে।’ বিনা বিবেচনায় অর্থ মওকুফের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুনে নিচ্ছি। ওদের বন্ধু-বান্ধব বলছে।’
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, ‘আমি শুনেছিলাম, পৌর কলেজে কোনো একটি বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। আমরা শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেখানে গেছি। তালা আমরা ভাঙ্গিনি। আর এটা সম্পর্কে কিছুই জানিনা।’
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি মুঠোফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।