আকাশ খবর অনুসন্ধান
বিশেষ প্রতিবেদক:
পাসপোর্টের নাম সংশোধনে ৩০ থেকে ৩২ হাজার, জন্ম তারিখ বদলাতে ৫০ হাজার। নতুন পাসপোর্ট করতে গেলে ৪ থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা ঘুষ! তুঘলকি এ কাণ্ড চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নিত্যদিনের। নির্দ্বিধায় ঘুষ নিচ্ছেন অফিস প্রধান, সহকারি, আনসার এমনকি দারোয়ান। পুরো অফিসের আশপাশে দালাল সিন্ডিকেটের শক্ত জাল। এসব ভেদ করে বৈধ পথে পাসপোর্ট করা অসম্ভব চুয়াডাঙ্গাবাসির। দৈনিক আকাশ খবরের অনুসন্ধানে ধরা পড়ে সে অফিসের দূর্নীতির ভেতর-বাহির। ধরা পড়ে সহকারি পরিচালকের নেতৃত্বে ঘুষ বাণিজ্যের সচিত্র সব ঘটনা। অনুসন্ধানে এসব অনিয়ম আর দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসার পর সংবাদ প্রকাশের আগেই অভিযুক্ত সহকারি পরিচালক মাহমুদুল আলম চৌধুরীকে প্রত্যাহার করেছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। তাকে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে প্রত্যাহার করে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়া যায়, চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বৈধ পথে গেলে কেউ নাকি করতে পারেন না পাসপোর্ট- এমন অভিযোগ পেয়ে গত ১ নভেম্বর থেকে পাসপোর্ট অফিস নিয়ে অনুসন্ধান চালায় দৈনিক আকাশ খবর।
চুয়াডাঙ্গার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারি পরিচালক মাহমুদুল আলম চৌধুরী
ছদ্মবেশে পাসপোর্ট অফিসে:
প্রথমদিনে আবেদনকারি হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ করে সরাসরি সহকারি পরিচালক মাহমুদুল আলম চৌধুরীর সাথে স্বাক্ষাৎ। পাসপোর্টের জন্ম-তারিখ সংশোধন করার আবেদন নিয়ে কথা হয় অফিস প্রধানের সাথে। এজন্য কি কি নিয়ম রয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়। শুরুর দিকে বিভিন্ন নিয়ম কানুনের কথা বললেন এডি মাহমুদুল। কিন্তু এত নিয়ম মেনে পাসপোর্ট সংশোধন করা যেন বিশাল ঝামেলা। তাই একটু ভিন্ন পথ অনুসরণের চেষ্টা। বলা হলো, কি করলে এই কাজ সহজ করা যায়? কথার ভাবে সকল ভোল পাল্টে অবৈধভাবে পথে হাটার পরামর্শ সহকারি পরিচালকের। শুরু হলো দেন-দরবার। একপর্যায়ে এডি নিয়ে গেলেন সিসি ক্যামেরার আড়ালে তার শয়নকক্ষে। সেখানে গিয়ে চেয়ে বসলেন ৫০ হাজার টাকা। টাকা দিলে জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া লাগবে না কিছুই, লাগবে না পুলিশ রিপোর্ট কিংবা এফিডেভিট। ঘুষের প্রস্তাবে রাজি হওয়ায় বেশ খুশি হলেন এডি। তখনই তিনি জানালেন, ঘুষের টাকা তুলে দিতে হবে অফিস সহকারি কাজী মিজানুর রহমারে হাতে। তারপরই শুরু হবে আসল কাজ….।
এবার পরদিন একই আবেদন নিয়ে পাসপোর্ট অফিস এলাকায় গড়ে ওঠা দালাল চক্রের আস্তানায় দৈনিক আকাশ খবর। পাসপোর্ট অফিসের সামনেই ‘পাসপোর্ট ফি কালেকশন বুথ’ নামের একটি ফটোকপির দোকানের দিকে নজর। সেখানে নাকি পাসপোর্টের সকল সমস্যার সমাধান করা হয়। তাই এবার ওই দোকানে গিয়ে কথা হয় উজ্জ্বল নামে একজনের সাথে। তার কাছেও একই প্রশ্ন, কিভাবে জন্ম তারিখ সংশোধন করা যাবে? উজ্জ¦লের সাফ জবাব, মাত্র ৩২ হাজার টাকা দিলেই আর কিছুই লাগবে না। ঢাকার আগারগাঁওয়ের প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে তার শক্তিশালী লোক। একমাসের মধ্যেই পাসপোর্ট করে দেয়ার গ্যারান্টি তার।
এরপর পাসপোর্ট অফিস ঘিরে দৈনিক আকাশ খবরের অনুসন্ধান চলে টানা কয়েকদিন। অনুসন্ধানে দেখা মেলে, পুরো অফিসে যত লোকজন যাওয়া-আসা করেন তাদের কেউই আবেদনকারি নন। তারা অধিকাংশই বাইরের ফটোকপি দোকানের মালিক-কর্মচারিরা। তারা যখন তখন ঢুকে পড়ছেন সহকারি পরিচালকের কক্ষে। করছেন ঘুষের হিসাব নিকাশ। অফিসের আনসার দারোয়ান থেকে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে তাদের বেশ সখ্যতা। হরহামেশাই তারা বহিরাগতরা ঢুকে পড়ছেন ছবি তোলা, ফিংগার স্ক্যানিংয়ের গোপন রুমে। করছেন অনধিকার চর্চা।
অনুসন্ধানে পাওয়া গেল, পাসপোর্ট সংশোধন বাণিজ্যে সহকারি পরিচালকের নেতৃত্বে অন্যান্যদের দুর্নীতির বিশাল জাল। প্রতিটি সংশোধনে অফিস প্রধান নিজেই গুণে নেন ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, ঘুষের টাকার সমন্বয় করেন অফিস সহকারি কাজী মিজান। দরকারি কাগজপত্র ছাড়াই সার্ভারে সেসব তথ্যাদি আপলোড করেন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মাসুদ। ভেতরে বাইরে আনসার সদস্যদের কাজ পাসপোর্ট করতে আসাদের সে লাইনে পৌঁছে দেয়া।
এডি মাহমুদুলের মুখোমুখি দৈনিক আকাশ খবর:
অনুসন্ধানের পর পাসপোর্ট অফিসের সহকারি পরিচালক মাহমুদুল আলম চৌধুরীর মুখোমুখি হয় দৈনিক আকাশ খবর। পরিচয় জানতে পেরে আগের দেয়া সব আশ^াস আর প্রস্তাব একবাক্যে উঁড়িয়ে দিলেন তিনি। ঘুষের টাকা দাবী ও সকল অনৈতিক কর্মকান্ডের গোটা বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। কিন্তু নিজের ঘুষ চাওয়ার ভিডিও রেকর্ড দেখার পর আর কোন জবাব দিতে পারেননি তিনি।
এডির কাছে প্রশ্ন ছিল, অফিসের আশপাশে এমন শক্ত দালাল সিন্ডিকেট কার স্বার্থে কাজ করে? তার সোজসাপ্টা জবাব, দালালরা সহযোগীতা করে সরকারকে।
এবার দালাল উজ্জ্বলের মুখোমুখি:
এবার পাসপোর্ট অফিসের সামনের ফটোকপি দোকান মালিক উজ্জ্বলরে কাছে জানতে চাই, অর্থের বিনিময়ে কিভাবে এমন কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়? তিনিও পরিচয় বুঝতে পেরে সকল কথা মিথ্যা দাবী করেন। উল্টো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন ‘আমি টাকা কেন চাইবো। আপনি প্রুভ দেখান।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ:
সংশোধনের বাইরেও বৈধ উপায়ে পাসপোর্ট করতে পারতে পারেন না নতুন আবেদনকারিরা। নতুন একটি পাসপোর্ট করতে সরকারি ফি’র বাইরেই গুনতে হয় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। যদি হয় সংশোধনের আবেদন, ঘুষ নিতে ঝাপিয়ে পড়েন অফিস দারোয়ান থেকে খোদ অফিস প্রধান।
শহরের ব্যবসায়ী সুমন পারভেজ বলেন, আমার পরিবারের দুই জন সদস্যের পাসপোর্ট করতে চুয়াডাঙ্গার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যাই। বৈধ উপায়ে পাসপোর্ট করতে গিয়ে নানান ঝামেলার মুখে পড়তে হয়। অফিস থেকেই পরামর্শ দেয়া হয় দালালদের সহযোগীতা নিতে। বাধ্য হয়েই দালালের হাতে তুলে দিতে হয় ২৫ হাজার টাকা। তারপর সহজেই হাতে পেয়ে যায় বহুল কাঙ্খিত পাসপোর্ট।
আরেক আবেদনকারি বৃষ্টি খাতুনের অভিযোগ, দফায় দফায় দালালদের হাতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছি। কিন্তু এখনো আমি আমার পাসপোর্ট হাতে পাইনি। তাদের সাথে যোগাযোগ করা আজ নয় কাল বলে ঘোরাতে থাকে। কবে পাসপোর্ট হাতে পাব তার কোন নিশ্চয়তা নেই।
শেখ শরীফ উদ্দীন নামে একজন জানান, দালাল ছাড়া পাসপোর্ট অফিসে কোন কাজই হয় না। সাধারন একটি ফর্ম ফিলাপ থেকে কঠিন কঠিন সব কাজ দালালরাই করে থাকে। দরকার শুধু টাকা। আর অফিসে গেলে তো কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টাকা ছাড়া কথাই বলেন না।
সংবাদ প্রকাশের আগেই এডি প্রত্যাহার:
পাসপোর্ট অফিস নিয়ে টানা অনুসন্ধান শেষে এসব তথ্য হাতে আসলে বিভিন্ন মহল থেকে ম্যানেজ করার চেষ্টা চলে। সংবাদ প্রকাশ না করতেও তদবির করা হয়। এরইমধ্যে সংবাদ প্রকাশের আগেই সহকারি পরিচালক মাহমুদুল আলম চৌধুরীর অনিয়মের ফিরিস্তি উদঘাটন হলে তাকে জেলা কার্যালয় থেকে প্রত্যাহার করা হয়। গত ৩ নভেম্বর পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তর তাকে প্রত্যাহার করে প্রধান কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখায় সংযুক্ত করে। অপরদিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ে সহকারি পরিচালক হিসেবে ইতিমধ্যে যোগদান করেছেন আব্দুস সাত্তার। অনেকের মত, এডি মাহমুদুলের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার আগেই তাকে প্রত্যাহার করে দায় সেরেছে অধিদপ্তর।