নিজস্ব প্রতিবেদক:
টেলিভশনে ততক্ষণে খবর হয়েছে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এই খবরে যেন আনন্দ ধারা বইছিল গোটা চুয়াডাঙ্গাজুড়ে। বিকাল গড়াতেই বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো জেলার মানুষ। কারও ডাকে নয়, কোন দলের নির্দেশে নয়। শত শত নয়, হাজারে হাজারে মানুষ শুধু স্লোগান দিয়েছেন আর বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে রাজপথে হেঁটেছেন। সেই সাথে নিয়েছেন বুক ভরে মুক্তির শ^াস। মাহেন্দ্রক্ষণের সেলফি বন্দি করে রাখতেও বাদ রাখেননি কেউ। সেদিন যেন কেবল আনন্দেই ভেসে যাচ্ছিল চুয়াডাঙ্গার রাজপথ।
সেদিন দুপুর দুইটা থেকে চুয়াডাঙ্গা শহর এক অনন্য উদাহরণ। এ উদাহরণ এ প্রজন্মের জন্য ছিল একেবারেই নতুন। এবারেই প্রথম। সকলে কথা বলতে পেরেও শান্তি পেয়েছে। আনন্দ-উল্লাস করেছে। তবে এই আনন্দ উল্লাসের সাথে অন্য একটি দিকে উত্তেজনাও দেখা গেছে। সেদিন মৃত্যু হয়েছিল চার যুবকের। আগুন দেয়া হয়েছিল চুয়াডাঙ্গার দুই সংসদ সদস্যের বাড়ি ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ বিভিন্ন নেতাদের বাড়িতে।
ওইদিন দেখা যায়, বিকেলে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরে শহরের বড় বাজার, কোর্ট মোড়, পৌরসভা মোড়, নতুনবাজার এলাকায় আনন্দ মিছিল বের হয়। আনন্দ মিছিল চলাকালে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ব্যানার-ফেস্টুন নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এসময় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ, দুই সংসদ সদস্যের বাড়ি, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যালয় ও নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর, গাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিশেষ করে শহরের কবরি রোডে দেখা যায়, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুনের বাড়ি ও তার ছোট ভাই রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটনের আলিশান বাড়ির দরজা ভাঙচুর করা হয়। গণভবনের মতো আওয়ামী নেতাদের বাড়িতে ঢুকেও উল্লাস করতে দেখা যায় ছাত্র জনতার। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলী আজগার টগরের বাড়িতে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। শহরসহ গ্রাম অঞ্চলেও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়িসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়াসহ হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। এছাড়াও আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা, দর্শনা ও জীবননগরে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ভাঙচুর চালানো হয়। একই সাথে রঙ মেখে আনন্দ মিছিলসহ সড়কে টায়ার জ¦ালিয়ে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে।
পরে ছাত্র-জনতার খণ্ড খণ্ড মিছিল বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় ছাত্র জনতার দখলে চলে যায় চুয়াডাঙ্গার প্রধান প্রধান সড়কসহ জনবহুল স্থান। পরে আওয়ামী বিরোধী স্লোগানসহ জ্বলন্ত আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে বিজয় সূচক চিহ্ন দিয়ে ছবি ওঠেন ছাত্র জনতা। এরপর একে একে লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার সরকারি কলেজ রোডের রাজনৈতিক কার্যালয়। ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় শহরের বিগবাজারে। ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় সাবেক পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরীর বাড়ি। এছাড়াও ইটপাটকেল ছোড়া হয় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আশাদুল হক বিশ্বাসের বাড়িতে। ইটপাটকেল ছোড়া হয় আশাদুল হক বিশ্বাসের ভাই আকরামুল হক খোকন বিশ্বাসের বাড়ির নতুন ভবনটিতে। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে। ভাঙচুর করা হয় হোটেল শয়ন বিলাসে। এছাড়াও আগুন দেওয়া হয় কেদারগঞ্জ বাজারে স্বেচ্ছাসেবক লীগের দলীয় কার্যালয়ে। ভাঙচুর করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা ও জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম সাহানের বাড়ি ও ব্যবসায়ী বাবুর বাড়িতে।
অপরদিকে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় উঠে আসে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সড়কের কাঠপট্টি সংলগ্ন একটি বাড়িতে অগ্নিকান্ডের খবর। এসময় সেখানে গোলাগুলিও হয়। বাড়ির গ্যারেজে থাকা প্রাইভেটকার ও একাধিক মোটরসাইকেলে আগুন লাগে। আগুন নিচ থেকে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। বাড়িতে আটকা পড়েন কয়েকজন ভাড়াটিয়া। খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের দুটি গাড়ি দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় নেভানো হয় আগুন। অক্ষত উদ্ধার হয় আটকে পড়ে ছয়জন। বাড়িটির মালিক চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আরিফিন আলম রঞ্জু। আগুন নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, বাড়ির মধ্যে চারটি পুড়ে যাওয়া মৃতদেহ পেয়েছেন তারা। মৃত দেহগুলি ঘর থেকে উদ্ধার করে বাড়ির ছাদে জড় করেন তারা।