নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা শহরের পলাশপাড়ায় ছেলের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নামাজরত বাবা খুন হওয়ার ঘটনার রহস্য ক্রমেই জটিল হচ্ছে। শুধু মোবাইল কেড়ে নেয়ার জেরে এমন নৃশংস হত্যাকান্ড নয়; বরং এর নেপথ্যে রয়েছে নিহতের স্ত্রীর প্রত্যক্ষ যোগসাজোস- এমন ভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন নিহত দোদুল হোসেন রিন্টুর আপন ছোটভাই আমীর মোহাম্মদ কবীর। তার অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার কলহের জেরে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ কাজে কিশোর ছেলেকে ব্যবহার করেছে তারই মা। হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে থাকতে পারে বহিরাগত কেউ! স্বজনদের দাবি, মোবাইল কেড়ে নেয়ার জেরে ছেলে ক্ষুব্ধ হয়ে বাবাকে হত্যা করেছে- এটি নিছকই পরিকল্পিত সাজানো নাটক। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি বের করতে আনতে দরকার সুষ্ঠু তদন্ত। পুলিশ তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত রহস্য।
জানা গেছে, গত ২২ মার্চ রাতে নিজ বাড়িতে নামাজ পড়া অবস্থায় উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় প্রবাসী ব্যবসায়ী দোদুল হোসেন রিন্টুকে। ঘটনার পরই হত্যার অভিযোগে তার ছেলে রিফাতকে (১৭) আটক করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে জানা যায়- ছেলের ব্যবহৃত মোবাইল কেড়ে নেয়ায় বাবার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পরদিন ভাইকে আসামী করে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের বড় মেয়ে জারিন ইয়াসমিন। সেদিনই আদালতে তোলা হয় অভিযুক্ত রিফাতকে। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দেন তিনি। পরে তাকে যশোর পুলেরহাটের শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়। অপরদিকে নিহত দোদুল হোসেনকে তার পৈত্রিকভিটা কুষ্টিয়ার গির্জানাথ মজুমদার সড়কের বাড়িতে নিয়ে সেখানেই দাফন সম্পন্ন করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুষ্টিয়া শহরের কমলাপুর গির্জানাথ মজুমদার সড়ক এলাকার মৃত কাজী নূর মোস্তফার ছেলে দোদুল হোসেন ওরফে কেএএম রিন্টু (৫০)। প্রায় ৩০ বছর আগে চুয়াডাঙ্গা শহরের সবুজপাড়ার ব্যাংক কর্মকর্তা কবির হোসেনের মেয়ে আইরিন পারভীন রত্নাকে বিয়ে করেন। বিয়ের কয়েক বছর পরই পাড়ি জামান ইতালিতে। প্রবাস থেকে স্ত্রী রত্নার নামে টাকা পাঠাতে থাকেন রিন্টু। রত্নার বাবার বাড়ি এলাকা চুয়াডাঙ্গা শহরের পলাশপাড়ায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন এবং চুয়াডাঙ্গাতেই স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। তিন বছর আগে রিন্টু প্রবাস ফিরে জানতে পারেন তার সমস্ত সম্পত্তি স্ত্রী রত্না নিজের নামে কিনেছেন। রিন্টুর নামে কানাকড়িও নেই। এ নিয়েও মাঝে মধ্যে পারিবারিক কলহ লেগেই থাকতো। এছাড়া স্ত্রী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত সন্দেহেও তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হতো।
ঘটনার পরদিন বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছিলেন, ঘটনার দিন রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের মেঝেতে পড়েছিলেন রিন্টু। রক্তাক্ত স্বামীকে ঘরে রেখেই মেইন গেটের কাছে এসে কাকে যেন ফোন করেছিলেন স্ত্রী রত্না। প্রায় ২০-২৫ মিনিট পর ভাড়াটিয়ারা প্রতিবেশীদের ডেকে রিন্টুকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। রিন্টুকে হাসপাতালে নেয়ার প্রায় আধাঘন্টা পর আসেন রত্না। যা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে প্রতিবেশীদের।
প্রতিবেশীরা আরও জানিয়েছেন, ঘটনার সময় পরনে থাকা কাপড় পরিবর্তন করে রত্না প্রায় আধা ঘণ্টা পর হাসপাতালে আসেন। এ সময় জরুরি বিভাগের সামনেই নিহত রিন্টু বোনের সাথে রত্নার একদফায় কথা কাটাকাটি হয়।
একইরকম অভিযোগ নিহতের স্বজনদের। নিহতের ছোটভাই আমীর মোহাম্মদ কবীর অভিযোগ করে বলেন, আমার ভাইয়ের শরীরে ৬-৭ বার ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। কিশোর ছেলের পক্ষে কি একা সম্ভব? অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে এটা দেখার পরও মা-মেয়ে কেন দোদুলকে হাসপাতালে নেয়নি; এমন কি কাউকে ডাকেওনি। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধে।
কবীরের অভিযোগ, রত্না পরকীয়ায় আসক্ত। স্বামী দেশে ফিরে আসায় তাদের পরকীয়া সম্পর্কের বাধা সৃষ্টি হয়। এতে পরিবারের সাথে ঝগড়া লেগেই থাকতো। এজন্য ছেলে মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলো। দীর্ঘদিন পর পিতা প্রবাস জীবন থেকে বাড়ি ফেরায় তার চলাচলেও গতি পরিবর্তন করতে হয়। যেটা স্বাভাবিকভাবে কেউ মেনে নিতে পারছিল না। এছাড়া, বিদেশ থেকে স্বামীর পাঠানো অর্থ রত্না নিজের নামেই রাখতো। স্ত্রী নিজেই সকল সম্পদ গড়েছেন। এমনকি দেশে ফেরার পর স্বামী যে ব্যবসা করতেন সে ব্যবসার টাকাও স্ত্রীর দখলেই ছিল। স্বামীর বিপুল সম্পদ ও টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়ার চক্রান্ত পুরাতন নয়।
ভাইয়ের আরও অভিযোগ, এ হত্যাকাণ্ডের নিজের দায় ছেলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে রত্না। এ হত্যাটি পূর্ব পরিকল্পিত। হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে থাকতে পারে তৃতীয় কোন ব্যক্তি। যা আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
ছোটভাই কবীর অভিযোগ করে বলেন, হত্যার পরপরই তড়িঘড়ি করে মেয়ে বাদি হয়ে এবং স্ত্রীকে স্বাক্ষী বানিয়ে মামলা দায়েরের ঘটনা মোটেও স্বাভাবিক নয়। মামলা করার সিদ্ধান্ত মা-মেয়ে এককভাবেই নিয়েছে। আমাদের পরিবারের ভাই-বোনসহ কারও সাথে কোন প্রকার আলোচনা করা হয়নি। তারা আগেই মামলা করে নিজেদের দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেছে।
নিহতের স্বজনদের দাবি, নিছক একটি ঘটনাকে সামনে না রেখে নেপথ্যের রহস্য জানতে সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজন। পুলিশ গভীর তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করলে বিচার কার্যক্রমও সুষ্ঠু হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আরও চুলচেরা তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে, নিজ বাবাকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার ছেলের দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে বাবা-মায়ের মধ্যে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির তদন্ত করছে। প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে দ্রুতই আদালতে চার্জশীট জমা দেয়া হবে।