ঝিনাইদহ অফিস:
ঝিনাইদহে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত শনিবার রাতে নিহতদের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো কেউ গ্রেফতার হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযানের খবরও পাওয়া যায়নি। তবে হত্যাকান্ডের ক্লু উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে গতকাল রবিবার শৈলকুপা থানায় পৃথক ৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমের এক সময়ের রক্তাক্ত জনপদ খ্যাত ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে চরমপন্থি দলগুলো। একসময় জাসদ গণবাহিনী, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি ও সর্বহারা পার্টির মতো নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দলের আধিপত্য ছিল তুঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরেই এসব চরমপন্থি দলগুলোর আধিপত্য দেখা যায়নি। হঠাৎ করেই এক চরমপন্থি নেতাসহ ৩ জনকে হত্যার পর আরেক চরমপন্থি সংগঠন পরিচয়ে
গণমাধ্যমে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো তাদের উত্থানের বার্তা বলে মনে করছেন অনেকে। বিগত দশকগুলোতে হত্যার আগে ও পরে এসব নিষিদ্ধ চরমপন্থি দলের পক্ষ থেকে দেওয়া হতো চিরকুট বা মোবাইল কল। তেমনিই ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে গত ২১ ফেব্রুয়ারি শৈলকুপার রামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্মশান ঘাট এলাকায়। গুলি করে হত্যা করা হয় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক কমান্ডার হানিফ ও তার দুই সহযোগীকে। হত্যার দায় স্বীকার করে আরেক চরমপন্থি সংগঠন জাসদ গণবাহিনী পরিচয়ে আগের মতো গণমাধ্যম কর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছে। চরমপন্থিদের এই উত্থান জনমনে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। তাহলে কি চরমপন্থিরা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এমন গুঞ্জন জেলা জুড়েই।
এদিকে নিহত ৩ জনের ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার বিকেলে তাদের পরিবারের কাছে মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়। পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক কমান্ডার হানিফকে হরিণাকুণ্ডুর আহাদনগর গ্রামে নামাজে জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয় ও তার শ্যালক লিটনকে শ্রীরামপুর গ্রামে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়। এ ছাড়া রাইসুল ইসলামকে রাত ৯টার দিকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পিয়ারপুর গ্রামে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি আমিনুর রহমান টুকু জানান, ৯০ দশকের দিকে এ অঞ্চলে নিষিদ্ধ চরমপন্থি দলগুলোর ব্যাপক দৌরাত্ম্য ছিল। প্রতিদিনই খুনের খবর শুনে মানুষের ঘুম ভাঙতো। মাথা কেটে পরিবারের লোকজনের সামনেই ফুটবলের মতো খেলতো এসব সন্ত্রাসীরা। পুলিশও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। মানবাধিকার লঙ্ঘন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এসব ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য এ অঞ্চলে পুলিশ ক্যাম্প বৃদ্ধি করা হয়। প্রশাসনের তৎপরতায় এক পর্যায়ে চরমপন্থি দল নির্মূল হয়ে যায়। দীর্ঘদিন চরমপন্থি দলের কোনো তৎপরতা ছিল না। হঠাৎ শৈলকুপায় ৩ খুনের মধ্যদিয়ে তাদের উপস্থিতি জানান দিল। তিনি আরও বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চরমপন্থি তৎপরতা খুবই দুঃখজনক। চরমপন্থি দমনে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
শৈলকুপা থানার ওসি মাসুম জানান, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। দাফন কাফনের জন্য তারা শনিবার মামলা করতে কেউ আসেননি। রবিবার ৩ পক্ষই থানায় আসেছেন। মামলা প্রক্রিয়াধীন। এলাকায় পুলিশী টহল জোরদার করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান জাকারিয়া জানান, থ্রি মার্ডারের পর থেকে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন ব্যাপক তৎপর রয়েছে। পুলিশের কাছে নানান ধরনের তথ্য আসছে। সেগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। জাসদ গণবাহিনী নামে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে এ হত্যাকান্ডকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার অপচেষ্টা কিনা সেটাও দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া হরিণাকুন্ডুর কায়েতপাড়া বাঁওড় নিয়ে বিবদমান দুই চরমপন্থি দলের মধ্যে এই খুনোখুনি কিনা তাও দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দ্রুত এই ট্রিপল মার্ডারের ক্লু উদ্ধার করতে আমরা সক্ষম হব। অপরাধীরা পার পাবে না।