আকাশ খবর ডেস্ক:
গত বছর ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যে ৯ দফা দাবি জানিয়েছিল তার ৭ নম্বর দাবিটি ছিল দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও সুপারিশ রাখা হয়েছে, দলের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠন, ভ্রাতৃপ্রতিমসহ যে নামেই হোক না কেন, না থাকার বিধান করতে হবে।
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে জরিপের ফল হিসেবে উল্লেখ করেছে, দেশের ৬৩.২৮ শতাংশ মানুষ লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গত ২২ সেপ্টেম্বর দিনব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে এক বৈঠকে ছাত্ররাজনীতি সংস্কারের বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব রাখেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। এতে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী), ছাত্র ফেডারেশন (গণসংহতি), গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
তাঁরা জানান, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করে ছাত্ররাজনীতি সংস্কার করা প্রয়োজন। তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে যে ভীতি রয়েছে তা কেটে যাবে।
গত অক্টোবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সাধারণ ছাত্রদের দাবি হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি যেন আর ফেরত না আসে। লেজুড়বৃত্তির ফলে যে নিপীড়ন হয় এবং অপরাজনীতির ধারা গড়ে ওঠে, সেটা যেন আর না হয়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ ও সংবিধিবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে ছাত্র ও শিক্ষকের অধিকারভিত্তিক রাজনীতি চাই। এটা নেতৃত্বের চর্চা ও গণতন্ত্র বিকাশের জন্য প্রয়োজন।
এ রকম আলোচনার মধ্যে গঠিত হতে যাচ্ছে ‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট, বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এই মূলমন্ত্র নিয়ে একটি নতুন ছাত্রসংগঠন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের একাংশ এই সংগঠনের উদ্যোক্তা। তাঁরা জানিয়েছেন, এই সংগঠন কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি করবে না।
সার্বিক এই অবস্থায় অনেকেই জানতে চান, ছাত্ররাজনীতিতে কি পরিবর্তন আসছে? কিন্তু উত্তর এখনো অস্পষ্ট এবং কিছুটা নেতিবাচক। গতকাল খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি নিয়ে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়বাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির গতকাল মঙ্গলবার বলেন, ‘ছাত্রদল সহযোগী সংগঠন হিসেবে আছে। একই আদর্শের রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন থাকলে তারা একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি করতে পারে। তা আইন করে বন্ধ করা সম্ভব নয়।’
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রশিবির কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিক সংগঠন নয়। আমাদের নিজস্ব সংবিধান ও কর্মপদ্ধতির আলোকেই সংগঠন পরিচালিত হয়। ছাত্রশিবির শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় ও সেবামূলক এজেন্ডা নিয়েই ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।’
আইনে যা আছে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯০(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র বা শিক্ষক; কোনো আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা শ্রমিক এবং অন্য যেকোনো পেশার সদস্যদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন করা নিষিদ্ধ। এই বিধান না মানলে সংশ্লিষ্ট দলের নিবন্ধনও বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার আছে নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু এই বিধান করার পর গত প্রায় ১৬ বছরে তা কার্যকর হয়নি। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে গঠনতন্ত্রে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ না থাকলেও বাস্তব কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো পরিবর্তনের দেখা মেলে না। গত বছর ১৫ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘মোকাবেলা’ করতে ছাত্রলীগকে প্রকাশ্যে নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
সম্প্রতি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের, ছাত্রদল বিএনপির এবং ছাত্রশিবির জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন হিসেবেই জনপরিসরে পরিচিত।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্র জানায়, ২০১০ সালের মার্চে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার বিষয়ে চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছিল। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও জনসভায় দেওয়া বত্তৃদ্ধতা উদ্ধৃত করে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ কয়েকটি দলের কাছে জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানাতে বলা হয়েছিল চিঠিতে।
তবে শামসুল হুদা কমিশনের পর কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, কে এম নুরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন এ বিষয়ে নির্লিপ্ত অবস্থান নেয়। ২০১৭ সালে কে এম নুরুল হুদা কমিশনের কাছে আইন লঙ্ঘন করে চালু থাকা রাজনৈতিক দলের এসব অঙ্গ, ভ্রাতৃপ্রতিম বা সহযোগী সংগঠন এবং দলগুলোর বিদেশি শাখার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানানো হয়েছিল বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী আইনে ব্যাপক সংস্কারসাধনের উদ্যোগ নিয়েছিল শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি। ওই সময় ইসির সঙ্গে সংলাপে সহযোগী বা অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে কয়েকটি দলের পক্ষে বলা হয়েছিল—‘পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত ও গণতান্ত্রিক দেশেই অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন বিদ্যমান এবং তা নিষিদ্ধ করা মৌলিক অধিকারের, বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের পরিপন্থী।’
জাতীয় পার্টি মত দিয়েছিল অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন বন্ধ করার পক্ষে। আর সব দলের অভিমত নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল সিপিবি। বিএনপিকে সে সময় ভাঙার চেষ্টা করা হয় এবং দলটির মূল অংশকে ওই সময় সংলাপে ডাকা হয়নি।
অন্যদিকে ওই বিধান করার পক্ষে ইসির বক্তব্য ছিল—এসব অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা স্বাধীনতার আগে বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সংগঠনের অবদানের কথা বিস্মৃত হয়ে আদর্শহীন রাজনীতির অপসংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠন কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা গত ১৫-১৬ বছরে ছাত্রলীগ প্রমাণ করে গেছে। তবে দেশে ফ্যাসিবাদী সরকার পতনে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর এবারের ভূমিকা প্রশংসিত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সক্রিয় ও সাহসী অংশগ্রহণ ছাড়া জুলাই-আগস্টের বিপ্লব অসম্ভব ছিল।
গত ৯ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘নিরাপদ বাংলাদেশ চাই’ নামের একটি নাগরিক সংগঠন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের অপকর্ম সম্পর্কে নিউদিল্লির সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন তাঁর মূল প্রবন্ধে বলেন, গত ১৫ বছরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের হাতে ৮৬ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। ধর্ষিত হয়েছেন ১৪ জন নারী। যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ৬৯ জনের সঙ্গে। সব মিলিয়ে এই ১৫ বছরে তাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন এক হাজার ৩২ শিক্ষার্থী। নিষিদ্ধ সংগঠনটির সদস্যরা ৫৩টি চাঁদাবাজি, ৩৯টি টেন্ডারবাজি ও ৩০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছেন। নিজেদের দলীয় কোন্দলে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৭ জন। পরীক্ষায় নকল, জালিয়াতি ও ভুয়া বাণিজ্যে গত ১৫ বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৭টি ঘটনার সবগুলোর সঙ্গেই ছাত্রলীগ জড়িত ছিল।