মিজানুর রহমান:
চুয়াডাঙ্গা জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চায়না গোলাপের চাষ ক্রমেই বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই গোলাপের ব্যাপক চাহিদা থাকায় চাষীরা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, তেমনি ফুল চাষ কেন্দ্রিক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রামে এখন দৃষ্টিনন্দন চায়না গোলাপের বাগান স্থানীয়দের নজর কাড়ছে।
বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রামে ২০ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চায়না গোলাপের চাষ হচ্ছে। প্রতিবিঘা জমিতে এই গোলাপ চাষে ৩ থেকে ৪ লক্ষ টাকা খরচ হয়। তবে প্রথম বছরেই প্রতি বিঘা থেকে ৬ থেকে ৭ লক্ষ টাকার গোলাপ বিক্রি করতে পারছেন চাষীরা। একবার চারা রোপণ করলে কয়েক বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। পরিচর্যার খরচও তুলনামূলক কম।
দেশী জাতের গোলাপ যেখানে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, চায়না গোলাপের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা। বিশেষ দিনগুলোতে, যেমন পহেলা বৈশাখ, ভালোবাসা দিবস বা বসন্ত উৎসবে, এই গোলাপের চাহিদা ও দাম উভয়ই বেড়ে যায়। চাষীদের মতে, চায়না গোলাপ আকারে বড়, পাপড়ির রং গাঢ় এবং স্থায়িত্ব ২০ দিন পর্যন্ত হওয়ায় এটি ক্রেতাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। অন্যদিকে দেশী গোলাপ ২-৩ দিনেই নষ্ট হয়ে যায়।
চুয়াডাঙ্গার উর্বর মাটি এবং অনুকূল জলবায়ু চায়না গোলাপ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। স্থানীয় কৃষি বিভাগ চাষীদের আধুনিক চাষপদ্ধতির প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছে। এর ফলে দিন দিন চাষীদের আগ্রহ আরও বাড়ছে। এই গোলাপ চাষের সফলতা চুয়াডাঙ্গার কৃষকদের জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা এনে দিয়েছে। ফুল চাষ কেন্দ্রিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহণ এবং বিপণন খাতেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতেও চুয়াডাঙ্গার চায়না গোলাপের সরবরাহ চলছে।
কৃষকরা জানান, চায়না গোলাপ চাষে প্রতি বিঘায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়, যা প্রথমে বেশ ব্যয়বহুল মনে হতে পারে। তবে এই বিনিয়োগের বিপরীতে প্রথম বছরেই প্রতি বিঘা থেকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করা সম্ভব হয়। এতে চাষীরা সহজেই তাদের প্রাথমিক খরচ উঠিয়ে নিতে পারেন এবং লাভের মুখ দেখতে পারেন। একবার চারা রোপণ করার পর টানা ৪ বছরের বেশি সময় ধরে এই গোলাপের ফলন পাওয়া যায়। এর ফলে চাষীদের পরিচর্যার খরচ কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। চুয়াডাঙ্গা দিগড়ি গ্রামের ফুল চাষী রাশেদ বলেন, “বর্তমানে দেশি জাতের গোলাপের চাহিদা কম এবং দামও কম। দেশি জাতের গোলাপ চাষে খরচ এবং চায়না জাতের গোলাপ চাষে খরচ প্রায় একই। তবে চায়না গোলাপের লাভ এবং চাহিদা অনেক বেশি। এ কারণেই আমরা চায়না গোলাপ চাষে আগ্রহী হচ্ছি।” একই গ্রামের আরেক ফুল চাষী বাদল বলেন, “গোলাপ চাষে প্রথম বছর খরচ হয়। তবে একটানা ৩ থেকে ৪ বছর ভালো ফলন পাওয়া যায়। ভালো লাভের আশায় এবার আমি ৪ বিঘা জমিতে চায়না গোলাপ চাষ করেছি।” বেগমপুর গ্রামের ফুল চাষী তরিকুল ইসলাম জানান, “আমি এই বছর প্রথমবার চায়না গোলাপ চাষ করেছি। এই জাতের গোলাপের চাহিদা অনেক, কিন্তু উন্নত মানের চারা পাওয়া বেশ কঠিন। চারা উৎপাদন ও সরবরাহ সহজ হলে আরও বেশি চাষী এই গোলাপ চাষে আগ্রহী হবে এবং এর চাষ ব্যাপকভাবে বাড়বে।” চুয়াডাঙ্গা বড় বাজারের ফুল ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, “দেশি জাতের গোলাপ সাধারণত ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়, কিন্তু চায়না গোলাপের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত হয়। এছাড়া দেশি জাতের গোলাপের তুলনায় চায়না গোলাপের পাপড়ি বেশি এবং স্থায়িত্বও অনেক বেশি। তাই ক্রেতাদের মধ্যে চায়না গোলাপের চাহিদা বেশি।” চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) দেবাশীষ কুমার দাস বলেন, “চুয়াডাঙ্গায় এ বছর ২০ বিঘারও বেশি জমিতে গোলাপের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে চায়না গোলাপের চাষ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লাল, গোলাপি এবং হলুদ রঙের চায়না গোলাপ চাষ করা হচ্ছে। এই জাতের ফুল স্থায়িত্বে উন্নত এবং পাপড়ির গুণগত মানের জন্য জনপ্রিয়। প্রায় ২০ দিনের বেশি সময় এই ফুল সতেজ থাকে। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চাষীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করছি।”