আজ রবিবার | ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ২৭শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

ভাষা পরিবর্তনঃ বাংলা ইংরেজি

ই-পেপার ভার্সন দেখতে ক্লিক করুন  e-paper

শিরোনাম
  • দর্শনায় আখচাষী কল্যাণ সংস্থার দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা
  • আলমডাঙ্গার ঘটনা কারণ জানতে তদন্ত কমিটি গঠন, ক্লিনিক সিলগালা
  • ধানে অখুশি, বিচালিতে খুশি
  • চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনে সভাপতিসহ আ.লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সাধারণ সম্পাদকে চমক
  • চুয়াডাঙ্গায় নারী পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্য সচেতনতা সভা 
  • চুয়াডাঙ্গা জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের আগামি ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন ৩১ ডিসেম্বর
  • ‘ব্যাংকিং সেবা প্রান্তিক কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে;  এমডি মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ
  • দামুড়হুদা সাড়াবাড়িয়া মাঠের কয়ারবিল খননের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু
  • মেহেরপুর সীমান্তে খুলেছে মানবতার দুয়ার
  • রয়েল ও পূর্বাশা বাস থেকে ৫ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ; ভারতীয় নাগরিকসহ আটক ১২
  • আমার প্রিয় শিক্ষক অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী

    মাধ্যমিক পাশ করার পর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছে ছিল, হলো না। পারিবারিক ঝামেলা ডিঙিয়ে উঠতে না পেরে দূরের কোনো ভালো কলেজে ভর্তি না হয়ে বাড়ির পাশের নাসিরকোট শহিদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজটিতে নয়জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিসৌধ আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে দেশপ্রেমিক তৈরির কারখানা হিসেবে যতটা অগ্রসরমান হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। এই কলেজে ২০১৩ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে হামিদুল হক মুন্সী যোগদান করলেন। একই বছর আমিও মাধ্যমিক পাশ করায় স্যারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাই। এই কলেজে যোগদানের আগে তিনি ছয়টি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্বই শুধু পালন করেননি; বহু পদক সম্মাননা, খ্যাতিও অর্জন করেছেন। সুশিক্ষার জাদুকর পদকে ভূষিত এই মানুষটি সূচনালগেড়বই আমাদের কলেজের হলঘরে ঢুকিয়েই তাঁর বক্তব্যে একের পর এক স্বপ্ন দেখাতে শুরু করলেন। বক্তৃতা দিতে পটু কালো গায়ের রঙের টাকওয়ালা আমাদের স্যার বললেন, এই কলেজে পরীক্ষা দিয়ে কোনো ছাত্র অকৃতকার্য হবে না, এই কলেজে কোনো টিনের ক্লাসরুম থাকবে না, এই কলেজ থেকে পাশ করে কোনো শিক্ষার্থী বেকার থাকবে না। তিনি বললেন, এই কলেজ হবে একটি ভিন্নধর্মী ফুলবাগান। যেখানকার ছাত্রছাত্রীরা প্রত্যেকেই এক একটি ফুটন্ত ফুল। এই ফুলের শোভা ছড়াবে জেলায় জেলায়, থানায় থানায়, ফুলের সুঘ্রাণে নাসিরকোট কলেজ ক্যাম্পাস ভরে যাবে। শহিদরা অন্যদের দেখিয়ে বলবে দেখ স্বাধীন দেশের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমন হয়, দেখ। একটার পর একটা স্বপ্ন চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলে তিনি বললেন, “এই ক্যাম্পাসে পার্ক হবে, ছোটো ছোটো বেঞ্চে অবসরে ছেলে মেয়েরা বসবে, বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ ডিসকাশন করবে। হাসতে-খেলতে ছেলে মেয়েরা মনের আনন্দে জ্ঞানচর্চা করবে।” তিনি বললেন, “এমন একটি কলেজ আমি করতে চাই, তোমরাও কী চাও?” স্যারের কথা শুনতে শুনতে আমরা এতই মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিলাম যে সমস্বরে চিৎকার করে বলেছিলাম, “হ্যাঁ, আমরাও চাই।” তিনি আমাদের অঙ্গীকার করালেন। আমরা সকলেই বুঝে-না-বুঝে অঙ্গীকার করলাম ভালোর জন্য যা যা প্রয়োজন আমরা তাই করব। এরপরে শুরু হলো
    উদ্যোগ: ১. যেখানে বেলা একটার মধ্যেই কলেজ বন্ধ হয়ে যেত সেখানে বিকেল চারটা পর্যন্ত ক্লাস চালু হলো এবং কলেজ ক্যাম্পাসে ক্যানটিন চালুর মাধ্যমে ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা। ২. পূর্বে যেখানে ক্লাস শেষ করেই শিক্ষকরা বাড়ি চলে যেতেন সেখানে তাঁদেরকে চারটা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে থেকে নিজেদেরকে পড়াশোনার প্রস্তুতি নিতে হতো এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অনুপস্থিতি, পাঠদানের অগ্রগতিঅবনতি বিষয়ে মনিটরিংপূর্বক অধ্যক্ষকে অবহিতকরণ এবং অন্যদিকে অভিভাবকদের অবহিত করার ব্যবস্থা। সন্ধ্যার পর অধ্যক্ষ স্যার নিজেও কিছু কিছু অভিভাবকের সাথে কথা বলে সহযোগিতা চাইতেন। ৩. তিনি সকলের জন্য কলেজ ড্রেস চালু করলেন। এমনকি শিক্ষকদের জন্যও। ড্রেস না থাকলে ক্লাসে ঢুকতে দিতেন না। শিক্ষার্থীরা গরম খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে কলেজে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে যায়। সত্যিই তারা কলেজে আসে তো? মাসে মাসে বেতন দেওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে টাকা নেয়, তা কলেজে দিচ্ছে তো? খোঁজ নিন। অভিভাবকদের চিঠি দিয়ে অবহিত করলেন। হাসতে হাসতে তিনি শিক্ষকদের সহায়তায় ফাঁকিবাজ ছাত্রছাত্রীদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেন। ৪. সাধারণত সে সময় ইংরেজি বিষয়ে ফেল করত বেশি।
    তিনি বিষয়ের শিক্ষকদের সহায়তায় এমনভাবে বছরের শুরু থেকে পদক্ষেপ নিলেন যে, সত্যি সত্যিই একটি পরীক্ষার্থীও পরীক্ষায় ফেল করেনি। পরীক্ষার হলে নকলের সুযোগ না দিয়ে সকল ছেলেমেয়েকে পাশ করিয়ে নেওয়ার কথাই তিনি বলেননি বাস্তব প্রয়োগেও তা প্রমাণ করেছেন। ফলে রাতারাতি আমাদের কলেজটি জেলার শীর্ষ কলেজে পরিগণিত হতে শুরু করল। স্যারের প্রশাসনিক খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল জেলার সর্বত্র। আমরাও ভালো কলেজের শিক্ষার্থীর মর্যাদা পেতে থাকলাম। শতকরা ৮০ ভাগ ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করতে দিতেন না। ফলে ক্লাসে হাজির হতেই হতো; অভিভাবক এনে অঙ্গীকারও দিতে হতো। নিয়ম না মানলে কলেজ ছেড়ে চলে যাওয়ার নোটিশ। প্রথম প্রথম এ সকল নিয়মাবলি মানতে আমাদের কষ্ট হলেও অভিভাবকদের চাপে আমরাও ক্লাস করতে বাধ্য হই, টেস্টে পাশ করে পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করতে বাধ্য হই। এ সকল নিয়মের তালে তালে কলেজও সামনের দিকে এগোতে থাকে। স্বপ্নবাজ অধ্যক্ষের স্বপ্নের জাদু বাস্তবায়ন হতে থাকে। স্যারের দেখা স্বপ্ন মোতাবেক মাত্র পাঁচ বছরে কলেজের চতুষ্পার্শ্বে এখন ভবন আর ভবন। ক্যাম্পাসটি একটি নগরবাউলের উপযোগী দৃষ্টিনন্দন পার্ক, সামনের বিশাল দিঘিতে ছোটো ছোটো বিনোদন নৌকা, যা সারাক্ষণ দোল খায়। স্যারের স্বপ্নের দোলনা আছে। কিন্তু স্যার আর নেই। সুদূর চুয়াডাঙ্গা থেকে হাজীগঞ্জ এসে তিনি হাতেকলমে দেখিয়ে গেলেন স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথরেখা। আকাক্সক্ষা ও দৃঢ়তার সাথে অগ্রসর হলে যে তা সফল হয় তা দেখলাম অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী স্যারের কল্যাণে।

    কামরুল ইসলাম, (বর্তমানে ইংরেজি অনার্সের ছাত্র, জা.বি.)।

    অনুবাদ »